জন্মঃ
কাজী ইসলাম ১৮৯৯ সালের ২৪ মে (জ্যৈষ্ঠ ১১, ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা কাজী ফকির আহমদ এবং মাতা জাহেদা খাতুন। তাঁর বাবা ফকির আহমদ ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম এবং মাজারের খাদেম। পিতার মৃত্যুর পর কাজী নজরুল ইসলাম স্থানীয় এক মসজিদে মুয়াজ্জিন হিসেবে কাজও করেছিলেন। কৈশোরে বিভিন্ন থিয়েটার দলের সাথে কাজ করতে যেয়ে তিনি কবিতা, নাটক এবং সাহিত্য সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান লাভ করেন।
তার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় মক্তবের ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে। ছাত্রজীবনে তার প্রথম স্কুল ছিল রাণীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুল। এছাড়াও তিনি মাথরুন উচ্চ ইংরেজি স্কুলসহ, ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালের দরিরামপুর স্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের শেষদিকে মাধ্যমিকের প্রিটেস্ট পরীক্ষা না দিয়ে তিনি সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে যোগ দেন। সৈনিক থাকা অবস্থায় তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেন।
এরপর ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কিছুদিন কাজ করার পর তিনি সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। এসময় তিনি ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। প্রকাশ করেন বিদ্রোহী এবং ভাঙার গানের মত কবিতা, ধূমকেতুর মত সাময়িকী। জেলে বন্দী হওয়ার পর লিখেন রাজবন্দীর জবানবন্দী। এই সব সাহিত্যকর্মে সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা ছিল সুস্পষ্ট।
তাঁর কবিতায় বিদ্রোহী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাঁকে বিদ্রোহী কবি নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাঁর কবিতার মূল বিষয়বস্তু ছিল মানুষের ওপর মানুষের অত্যাচার এবং সামাজিক অনাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ। তাঁর কবিতা ও গানে এই মনোভাবই প্রতিফলিত হয়েছে।
ধার্মিক মুসলিম সমাজ এবং অবহেলিত ভারতীয় জনগণের সাথে তার বিশেষ সম্পর্ক ছিল। তার সাহিত্যকর্মে প্রাধান্য পেয়েছে ভালবাসা, মুক্তি এবং বিদ্রোহ। ধর্মীয় লিঙ্গভেদের বিরুদ্ধেও তিনি লিখেছেন। ছোট গল্প, উপন্যাস, নাটক লিখলেও তিনি মূলত কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত।
কাজী নজরুল ইসলাম বিংশ শতাব্দীর অন্যতম জনপ্রিয় বাঙালি কবি, সঙ্গীতজ্ঞ, সংগীতস্রষ্টা, দার্শনিক। তিনি বাংলা ভাষার অন্যতম সাহিত্যিক, দেশপ্রেমী এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ – দুই বাংলাতেই তাঁর কবিতা ও গান সমানভাবে সমাদৃত।
কাজী নজরুল ইসলাম রচিত উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে অগ্নিবীণা (কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ), সঞ্চিতা, প্রলয়শিখা, মরুভাস্কর, বিষের বাশী, সিন্ধু হিন্দোল, সাম্যবাদী ইত্যাদি । ব্যথার দান (প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ), রিক্তের বেদন, শিউলিমালা লেখকের উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ। তাঁর রচিত প্রথম কবিতা মুক্তি । প্রথম উপন্যাস বাধনহারা। এছাড়াও মৃত্যুক্ষুধা, কুহেলিকা উল্লেখ্যযোগ্য উপন্যাস। নাট্যগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হচ্ছে ঝিলিমিলি (প্রথম নাট্যগ্রন্থ), পুতুলের বিয়ে, আলেয়া, এবং মধুমালা। কাজী নজরুল ইসলামের প্রবন্ধগ্রন্থের মধ্যে যুগবাণী (প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ), রাজবন্দীর জবানবন্দী, দুর্দিনের যাত্রী উল্লেখযোগ্য ।
বাংলা কাব্যে তিনি ইসলামী সঙ্গীত তথা গজলের মাধ্যমে এক নতুন ধারার জন্ম দেন। এর পাশাপাশি তিনি অনেক উৎকৃষ্ট শ্যামাসংগীত ও হিন্দু ভক্তিগীতিও রচনা করেন। নজরুল প্রায় ৩০০০ গান রচনা এবং অধিকাংশে সুরারোপ করেছেন যেগুলো এখন নজরুল সঙ্গীত বা "নজরুল গীতি" নামে পরিচিত এবং বিশেষ জনপ্রিয়।
মধ্যবয়সে তিনি পিক্স ডিজিজে আক্রান্ত হন। এর ফলে আমৃত্যু তাকে সাহিত্যকর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়। একই সাথে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ২৪ মে ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে সপরিবারে বিদ্রোহী কবিকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। ১৯৭৬ সালে জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করে।
বাংলা সাহিত্য এবং সংস্কৃতিতে তার বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারতে থাকাকালীন ১৯৪৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক জগত্তারিণী স্বর্ণপদক, ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধি, এবং ১৯৭৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে তাকে বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্মান সূচক পদক একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।এছাড়া ১৯৬০ সালে ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মভূষণে ভূষিত করা হয়।
মৃত্যুঃ
১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (তৎকালীন পিজি হাসপাতালে) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে কবিকে সমাহিত করা হয়।
শিল্প-সাহিত্যের নানা শাখায় আজো তিনি ‘উন্নত মম শীর’। নিপীড়িতের শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্তি কিংবা প্রেম ও মানবতার বাণীতে আজো তিনি সমুজ্জ্বল। তাঁর জন্ম ও মৃত্যু বার্ষিকী বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে উভয় বাংলাতে প্রতি বছর উদযাপন করা হয়।
No comments:
Post a Comment